ঈদ উপলক্ষ্যে অনেকেই ঘুরতে যাবেন দেশের নানা জায়গায়। তাই আপনাদের ভ্রমণের সুবিধার্থে আমরা নিয়ে এসেছি বাংলাদেশের বেশ কিছু জায়গা ভ্রমণের বিস্তারিত তথ্য, যাতে আপনাদের নিজ নিজ ভ্রমনগন্তব্যগুলো সম্পর্কে সম্পুর্ন ধারণা থাকে। ধারাবাহিকভাবে এই বিস্তারিত পোষ্টগুলো আমাদের এই পেইজে প্রকাশ করা হবে আগামী কয়েকদিনে। আপনাদের ভ্রমন হোক আনন্দময় ও নিরাপদ। খাগড়াছড়ি ভ্রমণ বিস্তারিতঃ আর মাত্র কদিন পরেই দুর্গাপূজা আর কোরবানির ঈদ, অর্থ্যাৎ লম্বা ছুটি। এই টানা ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন খাগড়াছড়ি থেকে। সৃষ্টিকর্তা অকৃপণভাবে সাজিয়েছে খাগড়াছড়িকে। স্বতন্ত্র করেছে বিভিন্ন অনন্য বৈশিষ্ট্যে। এখানে রয়েছে আকাশ-পাহাড়ের মিতালী, চেঙ্গী ও মাইনী উপত্যকার বিস্তীর্ণ সমতল ভূ-ভাগ ও উপজাতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যতা। যেদিকেই চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আর রহস্যময়তায় ঘেরা খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা প্রকৃতিপ্রেমী, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় বা ভ্রমণবিলাসীদের জন্য আদর্শ স্থান।প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে এ জেলার আনাচে-কানাচে। এ জেলার বৈচিত্র্যময় জীবনধারা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবাইকে বিমোহিত করে। দর্শনীয় স্থানঃ 1) তৈদুছড়া 2) আলুটিলা 3) আলুটিলার সুরঙ্গ বা রহস্যময় গুহা 4) দেবতার পুকুর 5) মহালছড়ি হ্রদ 6) শতায়ুবর্ষী বটগাছ 7) পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র 8) রিছাং ঝর্না 9) ভগবান টিলা 10) দুই টিলা ও তিন টিলা 11) মানিকছড়ি মং রাজবাড়ি 12) বন ভান্তের প্রথম সাধনাস্থল 13) রামগড় লেক ও চা বাগান যেভাবে যাবেনঃ রাজধানী ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আরামদায়ক বাস ছাড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০-১৫টি। সাইদাবাদ, কমলাপুর, গাবতলী, ফকিরাপুল, কলাবাগান ও টিটি পাড়া থেকে টিকেট সংগ্রহ করে এস আলম, স্টার লাইন, শ্যামলী, সৌদিয়া, শানিত্ম স্পেশাল ও খাগড়াছড়ি এক্সপ্রেসযোগে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে ট্রেনে ফেনী এসেও হিলকিং অথবা হিল বার্ড বাসে চড়ে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। চট্টগ্রামের অক্সিজেন থেকেও শানিত্ম স্পেশাল ও লোকাল বাসে উঠে যাওয়া যায় খাগড়াছড়িতে। কোথায় থাকবেনঃ পর্যটকদের জন্য খাগড়াছড়িতে রয়েছে অনেক আবাসিক হোটেল। পর্যটন মোটেলে থাকতে পারেন, এছাড়া আছে জিরান হোটেল, হোটেল শৌল্য সুবর্ণ, থ্রী স্টার হোটেল, হোটেল লবিয়ত। কিছু হোটেল এর ফোন নাম্বার দেওয়া হলোঃ পর্যটন মোটেলঃ ৬২০৮৪ ও ৬২০৮৫ হোটেল শৌল্য সুবর্ণঃ ৬১৪৩৬ জিরান হোটেলঃ ৬১০৭১ হোটেল লিবয়তঃ ৬১২২০ চৌধুরী বাডিং: ৬১১৭৬ থ্রি ষ্টার: ৬২০৫৭ ফোর ষ্টারঃ ৬২২৪০ উপহারঃ ৬১৯৮০ হোটেল নিলয়ঃ ০১৫৫৬-৭৭২২০৬ তৈদুছড়াঃ খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলায় সবুজ পাহাড় আর বুনো জঙ্গলের মাঝে অবস্থিত নয়নাভিরাম ঝর্না দুটির নাম তৈদুছড়া ঝর্না। ত্রিপুরা ভাষায় “তৈদু” মানে হল “পানির দরজা” আর ছড়া মানে ঝর্না। অসাধারণ সৌন্দর্য আর প্রাকৃতিক বৈচিত্রতা এই ঝর্নাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। খাগড়াছড়িতে যে কয়টি দর্শনীয় স্থান রয়েছে তৈদুছড়া তাদের মধ্যে অন্যতম। এখানে পাহাড় আর সবুজ বুনো জঙ্গেলর মাঝে আঁকা বাঁকা পাহাড়ের ভাঁজ দিয়ে বয়ে চলে ঝর্নার জল। ৩০০ ফুট উচু পাহাড় হতে গড়িয়ে পড়া পানি এসে পরছে পাথুরে ভূমিতে। অন্য সকল ঝর্নার মত এর পানি সরাসরি উপর হতে নিচে পরছে না। পাহাড়ের গায়ে সিড়ির মত তৈরি হওয়া পাথুরে ধাপ গুলো অতিক্রম করে নিচে পরছে। ঢাকা কিংবা খাগড়াছড়ি হতে গাড়ী নিয়ে সরাসরি যাওয়া যায় দীঘিনালায়। তৈদুছড়া ভ্রমনের জন্য খাগড়াছড়িতে রাত্রি যাপন না করে দীঘনালায় থাকাই উত্তম। এখানে থাকার জন্য একটি ভাল মানের রেষ্টহাউজ আছে। গাড়ী নিয়ে দীঘিনালা হতে সামনে এগিয়ে চাপ্পাপাড়া পর্যন্ত যাওয়া যায়। এর পর আর গাড়ী চলার কোন পথ না থাকায় বাকী পথটুকু হেঁটেই যেতে হবে। দীঘিনালা হতে সব মিলিয়ে তৈদুছড়ি পর্যন্ত পৌছতে প্রায় ৪ ঘন্টা সময় লাগে। নির্ভর করে হাঁটার গতির উপর। সুতরাং সকালে রওয়ানা দিলে অনায়েসেই সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসা সম্ভব। এই আসা যাওয়ার পথটি মোটেও বিরক্তিকর নয়। হাঁটতে হাঁটতে যতটা না ক্লান্তি আপনাকে গ্রাস করবে তার চাইতেও বেশী গ্রাস করবে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নেশা। চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় যে আপনি আসক্ত হবেনই। চাপ্পাপাড়া কিংবা পোমাংপাড়া হতে দুর্গম পথ, অনেক গুলো ঝিরি, উচু নিচু পাহাড়, কোথাও হাটু সমান আবার কোথাও বুক সমান পানি আর বুনো জঙ্গল পাড়ি দিয়ে অবশেষে প্রায় ৩ ঘন্টা হাঁটার পর আপনি পৌছবেন ১ম ঝর্নাটিতে। এটি প্রায় ৬০ ফুট উচু। ঝর্নামুখ হতে পানি পাহাড়ের গাঁয়ে পরে তা পাহাড় বেয়ে নিচে এসে ছোট একটি হ্রদের মিলিত হয়েছে। প্রথম ঝর্ণার ডানপাশ দিয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠলে খুব কাছাকাছি পেয়ে যাবেন ২য় ঝর্নাটি। এখানে প্রায় ৮০-৮৫ ডিগ্রী এঙ্গেলের ঢাল বেয়ে প্রায় ১০০ ফুট উপরে উঠতে হবে। উপরে উঠলে প্রথমেই চোখে পড়বে ঝর্না মুখ যেখান হতে ১ম ঝর্নার পানি পড়ছে। ২য় ঝর্না হতে ঝিরি পথে পানি আসছে এখানে। ঝিরি পথ ধরে প্রায় ঘন্টা খানেক হাটলে পরে পৌছানো যায় ২য় ঝর্নাটিতে। এই চলার পথটি যেমন কষ্টকর তেমনি রোমাঞ্চকর আর আহামরি সুন্দর। উপর থেকে প্রচন্ড বেগে পানি নেমে আসছে। এই বেগ ঠেলে পানি বরাবরই হাঁটতে হয়। ডানে বায়ে যেখানে পানির স্রোত কম সেখানে শ্যাওলা জমেছে। একটুতেই পা পিছলে যায়। মাঝে মাঝে এখানে পানির স্রোত খুব বেশী যে ধাক্কা দিয়ে নিচে নিয়ে যেতে চায়। তাই এখানে পা টিপে টিপে অনেক সাবধানে হাঁটতে হবে। একবার পিছলে গেলে কয়েকশ হাত দূরে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। এখান হতে আরো উপরে উঠতে হবে। চলার পথে পারি দিতে হবে বড় বড় পাথর আর কোমর সমান পানি। অতপর পেয়ে যাবেন দ্বিতীয় তৈদু ঝর্ণা। অপূর্ব নয়নাভিরাম সে ঝর্না। এটি এতই দৃষ্টিনন্দন আর ব্যতিক্রম যে কারো আর তড় সইবে না। ঝর্নার নিচে ঝাপিয়ে পরতে মন চাইবে। ঝর্ণাটি প্রায় ৮০ ফুট উচু। ঝর্নার পানি এসে সরাসরি যেখানে পড়ছে সেখানে সিড়ির মত অনেকগুলো পাথুরে ধাপ রয়েছে। ধাপগুলো বেয়ে পানি নিচে গড়িয়ে পড়ছে। ধাপগুলোতে দাড়িয়ে অনায়েসেই গোসলের কাজটি সেরে নেয়া যায়। দীর্ঘ ক্লান্তিকর হাটার কষ্ট মুহুর্তেই ধুয়ে যাবে ঝর্নার জলে। এখানে সারা বছরই পানি থাকে। শীতে জল প্রবাহ কমে যায়। আর বর্ষার হয়ে উঠে পূর্ণ যৌবনা। তবে শীতের আগে ও বর্ষার শেষে এখানে ঘুরতে যাওয়া উত্তম সিদ্ধান্ত। যেভাবে যেতে হবে: খাগড়াছড়ি হতে বাসে করে আসতে হবে দীঘিনালায়। দীঘিনালায় রাত্রি যাপন, সাথে তৈদুছড়া আসার জন্য প্রশাসনের অনুমতি গ্রহন ও গাইড নির্বাচন করে পরেরদিন ভোরে দীঘিনালা হতে গাড়ীতে/মোটরসাইকেলে করে চাপ্পাপাড়া। চাপ্পাপাড়া হতে পায়ে হেঁটে তৈদুছড়া। আলুটিলার সুরঙ্গ বা রহস্যময় গুহাঃ খাগড়াছড়ি শহর হতে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে মাটিরাঙ্গা উপজেলার আলুটিলা পযর্টন কেন্দ্রে রয়েছে একটি রহস্যময় গুহা। স্থানীয়রা একে বলে মাতাই হাকড় বা দেবতার গুহা। তবে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রে অবস্থিত বলে একে আলুটিলা গুহাই বলা হয় । এটি খাগড়াছড়ির একটি নামকরা পর্যটন কেন্দ্র। খাগড়াছড়ি বেড়াতে এলে সবাই অন্তত এক বার হলেও এখানে ঘুরে যায়। এটি একটি চমৎকার পিকনিক স্পট। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়, হৃদয় ছুয়ে যায়। আলুটিলা খাগড়াছড়ি জেলার সব চাইতে উচু পর্বত। নামে এটি টিলা হলেও মূলত এটি একটি পর্বতশ্রেনী। এখান হতে খাগড়াছড়ি শহরের বেশ কিছুটা অংশ দেখা যায়। শুধু তাই নয় পাহাড়ের সবুজ আপনার চোখ কেড়ে নেবে। আকাশ পাহাড় আর মেঘের মিতালী এখানে মায়াবী আবহ তৈরি করে। আলুটিলা রহস্যময় সুগঙ্গে যেতে হলে প্রথমেই আপনাকে পর্যটন কেন্দ্রের টিকেট কেঁটে ভীতরে প্রবেশ করতে হবে। ফটক দিয়ে পর্যটন কেন্দ্র প্রবেশের সময় আপনাকে মশাল সংগ্রহ করতে হবে। কারন রহস্যময় গুহাটিতে একেবারেই সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। পর্যটন কেন্দ্রের ফটক দিয়ে প্রবেশ করে ডান পাশের রাস্তা দিয়ে মিনিট খানে হাঁটলেই চোখে পড়বে একটি সরু পাহাড়ীপথ। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে গেছে এই পথটি। এই পথটি বেয়ে নিচে নামলেই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে প্রথম চমকটি। হঠাৎ চোখে পড়বে একটি ছোট ঝর্না। ঝর্নার পানি নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে ঝিরি বরাবর। তবে এখানে পাহাড়ী লোকজন ঝর্নার পানি আটকে রাখার জন্য একটি বাঁধ দিয়েছে। তারা এই পানি খাবার ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করে। আর ফটক হতে বাম দিকের রাস্তা বরাবর হাঁটলে পরে পাবেন রহস্যময় সেই গুহা। গুহাতে যাবার আগে আপনি পাবেন একটি বিশ্রামাগার ও ওয়াচ টাওয়ার। এর সামনে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে আলুটিলা গুহা মুখে। আগে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে হতো গুহামুখে। কিন্তু এখন পর্যটন কর্পোরেশন একটি পাকা রাস্তা করে দিয়েছে। ফলে খুব সহজেই হেঁটে যাওয়া যায় গুহামুখে। পাকা রাস্তা শেষ হলে আপনাকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হবে। প্রায় ৩৫০টি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলে পরে পাওয়া যাবে কাঙ্খিত সেই আলুটিলা গুহা। গুহাটি খুবই অন্ধকার ও শীতল। কোন প্রকার সূর্যের আলো প্রবেশ করে না তাই মশাল নিয়ে ভীতরে প্রবেশ করতে হয়। একেবারেই পাথুরে গুহা এটি। গাঁ ছম ছম করা পরিবেশ। খুব সাবধানে পা ফেলে সামনে এগুতে হয়। কারন সুরঙ্গের ভীতরে কোন আলো নেই। সুরঙ্গের তলদেশ পিচ্ছিল এবং পাথুরে। এর তলদেশে একটি ঝর্না প্রবাহমান। তাই খুব সাবধানে মশাল বা আলো নিয়ে গুহা পাড়ি দিতে হবে। পা ফসকে গেলেই আহত হতে হবে। তবে অন্য কোন ভয় নেই। গুহাটি একেবারেই নিরাপদ। এর দৈর্ঘ প্রায় ৩৫০ ফুট। গুহার ভীতরে জায়গায় জায়গায় পানি জমে আছে, রয়েছে বড় বড় পাথর। গুহাটির এপাশ দিয়ে ঢুকে ওপাশ দিয়ে বের হতে সময় লাগবে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। গুহাটি উচ্চতা মাঝে মাঝে এতটাই কম যে আপনাকে নতজানু হয়ে হাটতে হবে। সব কিছূ মিলিয়ে মনে হবে যেন সিনেমার সেই গুপ্তধন খোঁজার পালা চলছে। বিশ্বে যতগুলো প্রাকৃতিক রহস্যময় গুহা আছে আলুটিলা সুরঙ্গ তার মধ্যে অন্যতম। দেবতার পুকুরঃ জেলা সদর থেকে মাত্র ০৫ কি:মি: দক্ষিণে খাগড়াছড়ি – মহালছড়ি সড়কের কোল ঘেষে অবস্থিত মাইসছড়ি এলাকার আলুটিলা পর্বত শ্রেণী হতে সৃষ্ট ছোট্ট নদী নুনছড়ি। মূল রাস্তায় বাস থেকে নেমে কিলো দুয়েক পায়ে হাঁটা পথ। নিজস্ব পরিবহন থাকলে তা নিয়ে আপনি সোজা চলে যেতে পারেন একেবারে পাদদেশে নদীর কাছে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হলে পাহাড়ের কোলে খানিকটা জিরিয়ে নিতে পারেন। যাওয়ার পথেই দেখা যাবে নুনছড়ি নদীর ক্ষীণ স্রোতের মাঝে প্রকান্ড পাথর। স্বচ্ছ জলস্রোতে স্থির পাথর আপনাকে মোহিত করবে। ছবি প্রেমিক পর্যটকরা এখানে ছবি তোলেন। সমুদ্র সমতল হতে ৭০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের চূড়ায় এই দেবতার পুকুর অবস্থিত। কথিত আছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের জল তৃঞ্চা নিবারণের জন্য স্বয়ং জল-দেবতা এ পুকুর খনন করেন। পুকুরের পানিকে স্থানীয় লোকজন দেবতার আশীর্বাদ বলে মনে করে। দেবতার অলৌকিকতায় পুকুরটি সৃষ্ট বলে এতো উঁচুতে অবস্থানের পরও পুকুরের জল কখনও শুকোয় না। প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নরনারী পূণ্য লাভের আশায় পুকুর পরিদর্শনে আসে। কিংবদন্তীর দেবতার পুকুরটি ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কাছে পূজনীয়। মহালছড়ি হ্রদঃ কাপ্তাই বাঁধের ফলে কাপ্তাই হ্রদের পানি জমে নানিয়ারচর হয়ে মহালছড়ি পর্যন্ত এসেছে। বর্ষাকালে বিশাল জলরাশি জমাট হয়ে পরিণত হয় এক ফ্রিঞ্জল্যান্ডে। মহালছড়ি ডাকবাংলো হতে এ নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে যে কোন পর্যটক মুগ্ধ না হয়ে পারেন না। এ ছাড়া মহালছড়ি হতে এ হ্রদ দিয়ে রাঙামাটি যাওয়ার পথে দু’ধারের মনোরম ও নয়নাভিরাম দৃশ্য ভ্রমন পিপাসুদের ভাল লাগবেই। শতায়ুবর্ষী বটগাছঃ মাটিরাংগা উপজেলার খেদাছড়ার কাছাকাছি এলাকায় এ প্রাচীন বটবৃক্ষ শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয় এ যেন দর্শনীয় আশ্চর্যের কোন উপাদান। এ গাছের বয়স নিরূপনের চেষ্টা একেবারেই বৃথা। পাঁচ একরের অধিক জমির উপরে এ গাছটি হাজারো পর্যটকের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। মূল বটগাছটি থেকে নেমে আসা প্রতিটি ঝুড়িমূল কালের পরিক্রমায় এক একটি নতুন বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, ঝুড়িমূল থেকে সৃষ্ট প্রতিটি বটগাছ তার মূল গাছের সাথে সন্তানের মতো জড়িয়ে আছে। খাগড়াছড়ি কেউ যদি একবার আসেন তাহলে ভুলেও কেউ শতায়ু বর্ষী বটগাছ না দেখে ফিরে যান না। পাহাড়ী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রঃ খাগড়াছড়ি শহর থেকে মাত্র ৩ কি: মি: পূর্বেই কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। পাহাড়ের বুক চিড়ে রাস্তার দু’পাশে ফলের বাগান, স্বচ্ছ-স্থির জলরাশি, টিয়া সহ নানান প্রজাতির পাখি দেখে আপনি নিজেকে নতুনভাবে আবিস্কার করবেন আরেকবার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার লীলাভূমি এ কেন্দ্রটি। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী আসে শুধু সবুজের স্নিগ্ধতা মন্থনের আশায়। কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের অনিন্দ্য সুন্দর খামার যে কোন পর্যটককে মোহিত করার ক্ষমতা রাখে। রিছাং ঝর্নাঃ খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় অবস্থিত জেলার সবচাইতে বড় নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক ঝর্নাটির নাম হল রিছাং ঝর্না। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয় এর ভিন্ন প্রকৃতি একে দিয়েছে আলাদা পরিচিত। আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র হতে ৪ কি.মি. পশ্চিমে মূল রাস্তা থেকে উত্তরে গেলেই ঝর্ণার কলধ্বণি শুনতে পাবেন। জেলা শহর থেকে ঝর্ণা স্থলের দুরত্ব সাকুল্যে ১১ কি: মি: প্রায়। হাজার ফুট নীচের উপত্যকায় দৃষ্টি পড়লে কোন অপূর্ব মুগ্ধতায় যে কেউ শিউরে উঠবেন। ঝর্ণার সমগ্র যাত্রাপথটাই দারুণ রোমাঞ্চকর। দূরের উঁচু-নীচু সবুজ পাহাড়, বুনো ঝোপ, নামহীন রঙীন বুনো ফুল এসব নয়নাভিরাম অফুরন্ত সৌন্দর্য আপনাকে এক কল্পনার রাজ্যে নিয়ে যাবে। পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথ আর পথের দুধারে জমে থাকা সবুজ বনানী যাত্রা পথের সব ক্লান্তি দুর করে দিবে। পুরোটা পথ আপনি গাড়ী নিয়ে যেতে পারবেন না। ঝর্নার কিছু আগেই গাড়ী থেকে নেমে পায়ে হেঁটে যেতে হবে। পাহাড়ী পথটা মোটেও আরামদায়ক নয়। আপনাকে একটি বাশের লাঠি নিয়ে নিতে হবে তাতে পরিশ্রম কম হবে। লাল মাটির পথ মাড়াতে মাড়াতে বুঝতে পারবেন পাহাড়ী জীবন কতটা কষ্টকর। এভাবে হাটতে হাটতে একসময় কানে ভেসে আসবে গমগম করে পানি পড়ার শব্দ। বুঝতে পারবেন এসে পরেছেন রিছাং ঝর্না কাছে। দৃষ্টিনন্দন সে ঝর্না। সত্যিই সৌন্দর্যের আধার রিছাং ঝর্না যেন প্রকৃতির এক অপার সৃষ্টি। পাহাড়ের প্রায় ১০০ ফুট উপর হতে ঝর্নার পানি নিচে পড়ছে। নিচে পড়ার পর তা আবার আরও ১০০ ফুট পাথরের ওপর গড়িয়ে নেমে আসে সমতলে। উপর হতে নেমে আসা স্ফটিক-স্বচ্ছ জলরাশি নির্ঝরের স্বপ্নের মতো অবিরাম প্রবাহমান। পাহাড়ের কোল ঘেষে পাথরের উপর দিয়ে পানি নিচে পড়ার ফলে একটি পিচ্ছিল পথের সৃষ্টি হয়েছে। আপনি একটু সাহসী হলেই সেই পানির স্রোতের সাথে নিচে নেমে আসতে পারেন। মেতে উঠতে পারেন জলকেলিতে। যেভাবে যেতে হবেঃ খাগড়াছড়ি হতে চান্দেরগাড়ী বা পাবলিক বাসে করে যেতে হবে আলুটিলা। আলুটিলা ভ্রমন শেষে যেতে হেবে সরাসরি রিছাং ঝর্না। ভগবান টিলাঃ জেলার মাটিরাংগা উপজেলা থেকে সোজা উত্তরে ভারত সীমান্তে অবস্থিত ভগবান টিলা। জেলা সদর থেকে এর কৌণিক দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কি:মি: উত্তর-পশ্চিমে। ঘন সবুজের ভিতর আঁকা -বাঁকা রাস্তা দিয়ে যতই এগিয়ে যাবেন পাহাড়ের অপরূপ নৈসর্গে অপলক নেত্রে আপনি বিস্ময়-বিহবল হবেন। এ যেন বিধাতার নিজ হাতে গড়া পর্বত রূপসী। সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এ টিলা সম্পর্কে কথিত আছে, এতো উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে ডাক দিলে স্বয়ং ভগবানও ডাক শুনতে পাবেন। প্রাচীন লোকজন তাই এ টিলাকে ভগবান টিলা নামকরণ করেছিলেন। চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার ভগবান টিলায় দাঁড়ালে সবুজের নৈসর্গ আর মাথার উপরের আকাশের নীলিমা দারুণ উপভোগ্য। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি আউট পোষ্টও আছে এখানে। সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে দাঁড়ালে মনে হয় আপন অস্তিত্ত্ব শূন্যের নি:সীমতায় হারিয়ে গেছে। ঘন সবুজ বাঁশের ঝোপ, নাম না জানা কোন পাখির ডাক, পাহাড়ের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝর্নার জীবন্ত শব্দ – সবকিছু মিলিয়ে হারিয়ে যাওয়ার এক অনন্য লীলাভূমি। গহীন অরণ্যের এই উঁচু টিলায় বিডিআর এর তৈরী রেষ্ট হাউজটি আপনাকে পৃথিবীর যে কোন সুন্দর জায়গাকেও ভুলিয়ে দেবে। কোন এক জ্যোৎস্না রাতে নি:সীম অরণ্যের মাঝে কোন সাহসী পর্যটক যদি প্রকৃতিকে উপভোগ করতে চান তবে ভগবান টিলা তুলনাহীন। দুই টিলা ও তিন টিলাঃ প্রকৃতির এক অপূর্ব বিস্ময় এই দুই টিলা ও তিন টিলা। জেলা সদর থেকে ৪২ কি:মি: দূরে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-মারিশ্যা রাস্তার কোল ঘেষে এই টিলায় দাঁড়ালে ভূগোলে বিধৃত গোলাকৃতি পৃথিবীর এক চমৎকার নমুনা উপভোগ করা যাবে। খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা এবং দীঘিনালা থেকে মারিশ্যার বাসে চড়ে আপনি অনায়াসেই যেতে পারেন এখানে। পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে যেদিকে চোখ যায় মনে হয় যেন পৃথিবীর সমস্ত সবুজের সমারোহ এখানেই সমষ্টি বেঁধেছে। পাহাড়ের বুক চিড়ে সর্পিল রাস্তা নি:সর্গের এক নতুন মাত্রা বলে মনে হবে। দুই টিলার অচেনা দৃশ্য আপনার কল্পনাকেও হার মানাবে। মনে হবে এ যেন ক্যানভাসের উপর কোন বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়। সারা মারিশ্যা ভ্যালী যেন পায়ের কাছে এসে জড়ো হয়েছে। যে কোন পর্যটকের কাছে এ দৃশ্যটি আকর্ষনীয়। মানিকছড়ি মং রাজবাড়িঃ জেলার মানিকছড়ি উপজেলার মং সার্কেলের রাজার প্রাচীন রাজবাড়ি এবং রাজত্বকালীন স্থাপত্য খাগড়াছড়ি জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। রাজার সিংহাসন, মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্রসহ প্রত্নতাত্ত্বিক অনেক স্মৃতি বিজড়িত এ রাজবাড়ি। যদিও সুষ্ঠু সংরক্ষণ, যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে হারিয়ে গেছে অনেক কিছু। মং রাজার ইতিহাস, সংস্কৃতি জানা ও দেখার জন্য ঘুরে যেতে পারেন মং রাজবাড়ি। বন ভান্তের প্রথম সাধনাস্থলঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ধর্মীয় মহাসাধক আর্য পুরুষ, আর্য শ্রাবক বুদ্ধ সাধনানন্দ মহাস্থবির বন ভান্তে। তাঁর জন্ম রাঙামাটি সদর উপজেলার ধনপাতা গ্রামে। সাধনাস্থল দীঘিনালা। বন ভান্তের প্রথম সাধনাস্থলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ২০ একর ভূমির ওপর দীঘিনালা বন বিহার। এ বিহারে রয়েছে ২৩ ফুট উচ্চতার ধ্যানমগ্ন গৌতমবুদ্ধের মূর্তি, ১৩ ফুট উচ্চতার শিবলি মূর্তি, উপগুপ্ত বুদ্ধ (জলবুদ্ধ)সহ বিহার কমপ্লেক্সের স্থাপনা ও প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য। এ সাধনাস্থলকে ঘিরে গড়ে ওঠা পানছড়ি অরণ্য কুটির, পেরাছড়া বন বিহার দেখলে যেকোনো পর্যটকের মন জুড়িয়ে যাবে। রামগড় লেক ও চা বাগানঃ সীমানত্ম শহর রামগড় উপজেলা সদরে নান্দনিক সৌন্দর্যমন্ডিত কৃত্রিম লেক নানাদিক থেকে আনন্দ যোগায় পর্যটকদের। রামগড় সদরের খুব কাছেই বাগান বাজার এলাকায় পাহাড়ী পরিবেশে চা-বাগান ও পিকনিক স্পট। এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন আদিবাসী সাওঁতালরা। আগ্রহ করে জানা যাবে তাদের জীবন ও জীবিকা সম্পর্কে। চা-বাগানের অভ্যনত্মরে রয়েছে শাপলা ফোটা বিশাল প্রাকৃতিক লেক। কিছুদিন পর এ লেকে আসবে শীতের নানান জাতের অতিথি পাখি।
Your email address will not be published. Required fields are marked *
Save my name, email, and website in this browser for the next time I comment.